রোগ-ব্যাধি মহান আল্লাহর নেয়ামত ও পরীক্ষা। খুব কম মানুষই আছেন যারা জীবনে কোনো অসুস্থতার মুখোমুখি হননি। অসুস্থতার সময় মুমিনের কর্তব্য হলো ধৈর্য ধারণ করা, চিকিৎসা নেওয়া এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করা।
মহানবী (সা.) সবসময় রোগীর প্রতি সহমর্মী ছিলেন, রোগীকে সান্ত্বনা দিতেন, খোঁজ নিতেন। তিনি রোগীকে দেখতে যাওয়া মুসলমানের অধিকার হিসেবে গণ্য করেছেন।
রোগের কারণে পাপ মোচন হয়
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মুসলিম ব্যক্তির উপর যে কষ্ট ক্লেশ, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানী আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে ফুটে, এ সবের মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।(বুখারি)।
আরেক হাদিসে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুল (সা.) এর কাছে গেলাম। তখন তিনি জ্বরে ভুগছিলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি তো ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত।
তিনি বললেন, হ্যাঁ। তোমাদের দু’ব্যক্তি যতটুকু জ্বরে আক্রান্ত হয়, আমি একাই ততটুকু জ্বরে আক্রান্ত হই। আমি বললাম, এটি এজন্য যে, আপনার জন্য আছে দ্বিগুণ সাওয়াব।
তিনি বললেন, হ্যাঁ তাই। কারণ, যে কোন মুসলিম দুঃখ কষ্টে পতিত হয়, তা একটা কাঁটা কিংবা আরও ক্ষুদ্র কিছু হোক না কেন, এর মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহগুলোকে মুছে দেন, যেমন গাছ থেকে পাতাগুলো ঝরে পড়ে। (বুখারি)।
রোগে ধৈর্য ধারণের উপদেশ
নবীজি (সা.) বলেছেন, মুমিনের ব্যাপার আশ্চর্যজনক। অবশ্যই তার সব বিষয় তার জন্য কল্যাণময়। আর এটি মুমিন ছাড়া অন্য কারো জন্য হতে পারে না। যদি তার কোন আনন্দ আসে, তবে সে শুকরিয়া আদায় করে, যা তার জন্য কল্যাণময়। আর যদি তার উপরে কোন দুঃখজনক কিছু আপতিত হয়, তাহলে সে সবর করে, সেটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।। (মুসলিম)।
আরেক আনাস (রা.) বর্ণনা করেন যে, আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, যখন আমি আমার বান্দাকে তার দুই প্রিয় জিনিস (চোখ) কেড়ে নিয়ে পরীক্ষা করি এবং সে ধৈর্য ধরে আমি তাকে এ দু’টির বিনিময়ে জান্নাত প্রদান করব। (বুখারি)।
রোগীকে দেখতে যাওয়া
নবীজি (সা.) অসুস্থদের খোঁজ নিতেন এবং তা মুসলমানের হক হিসেবে গণ্য করেছেন। এক হাদিসে হজরত আবু মুসা আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ক্ষুধার্থকে খাবার দিও, অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যেও, বন্দী ব্যক্তিকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করো। (বুখারি)।
আরেক হাদিসে বলা হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, এক মুসলিমের প্রতি অপর মুসলিমের হক পাঁচটি—
১. সালামের জবাব দেওয়া, ২. হাঁচিদাতাকে (তার আলহামদু লিল্লাহ বলার জবাবে) রহমতের দোয়া করা, ৩. দাওয়াত কবুল করা, ৪. অসুস্থকে দেখতে যাওয়া এবং ৫. জানাযার সাথে গমন করা।(মুসলিম)।
রোগী দেখতে যাওয়ার ফজিলত
নবীজি (সা.) বলেছেন, এক মুসলমান যখন আরেক মুসলমানকে দেখতে যায়, তখন সে জান্নাতের বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করতে থাকে যতক্ষণ না ফিরে আসে (মুসলিম)।
আরেক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যখন কেউ অসুস্থকে দেখতে যায়, ফেরেশতার একটি দল তাকে বলে, তোমার পথ চলা হোক কল্যাণময়, জান্নাতে তোমার জন্য প্রস্তুত রয়েছে উচ্চ মর্যাদা (তিরমিজি)।
হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে, সকালে রোগীকে দেখতে গেলে সত্তর হাজার ফেরেশতা বিকেল পর্যন্ত তার জন্য দোয়া করে; সন্ধ্যায় গেলে সকাল পর্যন্ত দোয়া করে। (তিরমিজি)।
নবীজি (সা.) শুধু মুসলমানদেরই রোগ-শোকে খোঁজ-খবর রাখতেন না, বরং ভিন্ন ধর্মের মানুষদের রোগের সময়ও তিনি খোঁজ নিতেন। একবার তিনি এক অসুস্থ ইহুদি কিশোরকে দেখতে গিয়েছিলেন। তখন তিনি তাকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান করেন এবং সে ইসলাম গ্রহণ করে। নবীজি (সা.) তখন বের হয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছিলেন: আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেছেন। (বুখারি)।
রোগী দেখতে যাওয়ার নববী পদ্ধতি
রোগী রোগীকে সাহস দিতেন, রোগী খুশি হয় এবং কষ্ট ভুলে যায় এমন কথা বলতেন। বলতেন, তোমার কোন ক্ষতি নেই, আল্লাহ চাইলে রোগ গুনাহ মাফ করে তোমাকে পবিত্র করবে। (বুখারি)।
ইবনুল কায়্যিম বলেন, নবীজি (সা.) রোগীর খোঁজ নিতেন, সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করতেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিতেন, তার কপালে হাত রাখতেন এবং তার জন্য দোয়া করতেন।
নবীজি (সা.) রোগীর মাথার কাছে বসতেন, তার জন্য দোয়া করতেন । তিনি দোয়া করে বলতেন—
اَذْهَبِ الْبَأْسَ رَبَّ النَّاسِ - وَاشْفِ اَنْتَ الشَّافِي - لَا شِفَاءَ اِلَّا شِفَائُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
উচ্চারণ: আজহাবিল বা’সা রব্বান না-সি, ওয়াশফি আনতাশ শা-ফি-, লা শিফাআ’ ইল্লা- শিফা-উকা শিফা-আ’ লা ইউগাদিরু সুক্বমা।
অর্থ: ‘হে মানুষের প্রতিপালক! এ রোগ দূর কর এবং আরোগ্য দান কর, তুমিই আরোগ্য দানকারী। তোমার আরোগ্য ব্যতিত কোনো আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য, যা বাকী রাখে না কোনো রোগ।’ (বুখারি, মিশকাত)
চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহ দিতেন মহানবী (সা.)
নবীজি (সা.) চিকিৎসা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মহান আল্লাহ বার্ধক্য ছাড়া এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি যার সাথে প্রতিষেধকেরও ব্যবস্থা করেননি (রোগও রেখেছেন, নিরাময়ের ব্যবস্থাও রেখেছেন)। (তিরমিজি)।
নবীজি (সা.) হারাম জিনিস দিয়ে চিকিৎসা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা হারাম বস্তুর মধ্যে তোমাদের জন্য কোন চিকিৎসা রাখেননি। (ইবন হিব্বান)।
রাসুল (সা.) দোয়া ও কোরআনের মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণকে সর্বোত্তম বলেছেন...(আহমদ)।
ডেস্ক/ই.ই
মন্তব্য করুন: