[email protected] ঢাকা | বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৯শে মাঘ ১৪৩২
thecitybank.com

চাঁপাইনবাবগঞ্জে তিনটি আসনেই জিততে মরিয়া বিএনপি-জামায়াত, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

নিজস্ব প্রতিনিধি:

প্রকাশিত:
১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৩:০৮

উপরের বামে অধ্যাপক শাহজাহান মিঞা, মাঝে আমিনুল ইসলাম, শেষে হারুনুর রশিদ এবং নিচের বামে কেরমাত আলী, মাঝে মিজানুর রহমান, শেষে নুরুল ইসলাম বুলবুল। ছবি: চাঁপাই জার্নাল

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার তিনটি আসনের মধ্যে দু’টিতে জামায়াতে ইসলামীর জয়ের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালের সেই জয়ের ধারা এবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ফিরিয়ে আনতে দিন-রাত এক করে লড়ছেন দলটির কর্মী-সমর্থকরা। অপরদিকে দীর্ঘ সময় ধরেই এই জেলায় বিএনপির অবস্থান সুসংহত। সেই জয়ের ধারাবাকিতা রক্ষায় কোনো কমতি রাখতে রাজি নন নেতাকর্মীরা। ভোটে দলীয় ‘বিদ্রোহী’ বা দলে প্রকাশ্যে বিভক্তি না থাকলেও বিএনপি জয়ের জন্য খামতি রাখতে চায় না।

আওয়ামী লীগহীন ভোটের মাঠে তিনটি আসনেই তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী। যদিও এখানে আওয়ামী লীগের ভোট টানতে দুই দলের নেতারাই সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সেই ভোট দুই দলের ‘ভোট-ব্যাংকের’ বাইরে জয়-পরাজয়ের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।

ভোটের প্রচারের ক্ষেত্রে আসন ভেদে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা আছে। কোথাও প্রচারের মাত্রা ভাল হলেও কোথাও আবার ‘ফাঁকা ফাঁকা’। ভোটারদের অভিমত, আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় এ অবস্থা হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসন:

শিবগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন অধ্যাপক শাহজাহান মিঞা। এখানে তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতে ইসলামীর ড. কেরামত আলীর, এমনটাই ভোটারদের ধারণা। এছাড়া এখানে আব্দুল হালিম (সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট), নবাব শামসুল হোদা (ইসলামী ফ্রন্ট), আফজাল হোসেন (জাতীয় পার্টি) ও মনিরুল ইসলাম (ইসলামী আন্দোলন) ভোটের লড়াইয়ে আছেন। তারাও নিয়মিত প্রচার ও গণসংযোগ করছেন। এখানে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী নেই।

ভোট নিয়ে কথা হয় উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের আবুল কালাম, মোবারকপুর ইউনিয়নের সেতাব উদ্দিন, কানসাট ইউনিয়নের হাফিজুর রহমান এবং শিবগঞ্জ পৌর এলাকার রনি আহমেদের সঙ্গে।

আবুল কালাম বলছিলেন, এই আসনে প্রার্থী সংখ্যা ছয়জন হলেও ভোটের মাঠে জামায়াত ও বিএনপির প্রচার বেশি শোনা যাচ্ছে। অন্য প্রার্থীর প্রচার তেমন নেই। দুই-এক জায়গায় লাঙ্গলের ব্যানার ফেস্টুন দেখা গেলেও অন্যদের তাও নাই।

সেতাব উদ্দিন বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। জয়ের জন্য দু’দলই চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘুর ভোট পক্ষে টানার।

হাফিজুর রহমান বলেন, বিএনপির শাহজাহান মিঞা এমপি হয়েছিলেন পাঁচবার আর জামায়াতে ইসলামীর কেরামত আলী উপজেলার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন দুইবার। তাই এ আসনে ভোটের অংক মেলানো কঠিন।

জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, এই আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ ১৮১ জন। নারী ২ লাখ ৪৪ হাজার ৮৬৫ এবং পুরুষ ২ লাখ ৫৫ হাজার ৩১৬। এর মধ্যে তরুণ ভোটার ৭ হাজার ৬০২। নির্বাচনে এ আসনে ১৫৯টি ভোটকেন্দ্রের ৯৩৬টি কক্ষে ভোটগ্রহণ করা হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসন:

নাচোল, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট উপজেলার নিয়ে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসন। এখানে পাঁচজনই দলীয় প্রার্থী। এরমধ্যে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে লড়ছেন বিএনপি নেতা আমিনুল ইসলাম। আওয়ামী লীগের প্রবল প্রতাপের মধ্যেও ২০১৮ সালে তিনি এখান থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন। এতেই বোঝা যায়, আসনটি বিএনপির শক্ত ভিত্তি রয়েছে। যদিও আসনটিতে ১৯৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী মীম ওবায়দুল্লাহ বিজয়ী হয়েছিল।

ভোটারদের ধারণা, আমিনুল ইসলামের সঙ্গে এখানে লড়াই হবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. মিজানুর রহমানের। তিনি দলের সাংগঠনিক শক্তির উপর ভিত্তি করে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এর বাইরে খুরশিদ আলম বাচ্চু (জাতীয় পার্টি), সাদেকুল ইসলাম (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পাটি-সিপিবি) এবং ইব্রাহিম খলিল (ইসলামী আন্দোলন) ভোটের মাঠে প্রচার ও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই আসনের ভোট নিয়ে কথা হয় নাচোল উপজেলার কসবা ইউনিয়নের সেলিম রেজা, নেজামপুর ইউনিয়নের টুনু পাহান, গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর পৌর এলাকার রিপন আলী এবং ভোলাহাট উপজেলার বড়গাছি এলাকার আব্দুস সামাদের সঙ্গে।

সেলিম রেজা বলছিলেন, আসনে নির্বাচনি প্রচারে বিএনপি ও জামায়াত বেশি সরগরম। মনে হবে, দুই পার্টির নির্বাচন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থীও প্রচার চালাচ্ছেন।

এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকায় ভোটের মাঠে উত্তেজনা কম। বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতের প্রার্থীর।

টুনু পাহান বলেন, নির্বাচনে আদিবাসীরা কিছুই চায় না, শান্তিতে থাকতে চায়। যেই দলই জিতুক সরকারি পুকুর দখল, জমি দখল, হানাহানি চাই না। রাতে আরামে যেন ঘুমাতে পারি।

রিপন আলী বলেন, ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে আছে বলে মনে হয়। কিন্তু দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সুযোগ নিতে পারে জামায়াতে ইসলামী। যদি বিএনপির সবাই এক না হয়, তাহলে জামায়াতের লাভ হবে।

আব্দুস সামাদ বলেন, বড়গাছি জামবাড়িয়া ও চৌডলা এলাকায় জাতীয় পার্টি কিছু ভোট পাবে। তবে এ আসনের মূল লড়াই হবে বিএনপি আমিনুল ইসলামের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর মিজানুর রহমানের।

জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৬১ হাজার। এর মধ্যে নারী ২ লাখ ৩২ হাজার ১৭৪ এবং পুরুষ ২ লাখ ২৮ হাজার ৮২৫। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন একজন। এরমধ্যে তরুণ ভোটার ৬ হাজার ৬৫৫ জন। আসনের ১৮৪টি ভোটকেন্দ্রের ৮৭৭টি কক্ষে ভোট গ্রহণ করা হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসন:

জেলার তিনটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে জমজমাট নির্বাচন হচ্ছে সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে। এখানে জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। লতিফুর রহমান এখান থেকে ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালে বিজয়ী হয়েছিলেন। এরপর জামায়াত এখানে আর কখনও জয় পায়নি। তবে সব নির্বাচনে তারা শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তির জানান দিয়েছে।

নির্বাচনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৮ সালে বিএনপি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে লড়ে জামায়াত নেতা লতিফুর রহমান এখানে এককভাবে ৭২ হাজার ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছিল। যেখানে বিএনপি হারুনুর রশিদ ৭৬ হাজার ভোট নিয়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন। জয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ। এরআগে ২০০১ সালের নির্বাচনেও হারুনুর রশিদ বিএনপির টিকেটে সাড়ে ৮৫ হাজার ভোট নিয়ে জয় পেলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লতিফুর রহমান ৬০ হাজারের অধিক ভোট নিয়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন। সেবার আওয়ামী লীগ তৃতীয় হয়েছিল।

জাতীয় সংসদে বিএনপির দুঃসময়ে হারুনুর রশিদ দলকে আসনটি উপহার দিয়েছিলেন। তিনি এরআগে ১৯৯৬ সালের জুনেও সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। এবারও তিনি ধানের শীষ নিয়ে লড়াই করছেন। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নেতা নুরুল ইসলামকে পেয়েছেন।

ভোটারদের অভিমত, এখানে দুই দলের শক্তি হচ্ছে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা। সমানে সমানে দল দুটি পাল্লা দিতে পারে। দুটি দলের ভোটের ব্যবধানও অল্প। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ‘ভোট ব্যাংক’ যারা ঝুলিতে নিতে পারেবন তাদের দিকেই জয়ের পাল্লা ভারী হবে। আগে থেকে বলা যাবে না, এখানে শেষ পর্যন্ত জয় কার হবে। এই আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন- ফজলুর ইসলাম খাঁন (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি), শফিকুল ইসলাম (গণঅধিকার পরিষদ) ও মনিরুল ইসলাম (ইসলামী আন্দোলন)।

আসনটির ভোটের পরিস্থিতি নিয়ে নিয়ে কথা হয় সদর উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের শহিদুল ইসলাম, রানিহাটি ইউনিয়নের জুবায়ের, পৌর এলাকার পুরাতন বাজারের আবু তালেব, শিবতলা মহল্লার নিখিল চন্দ্র কর্মকার, আমনুরা ইউনিয়নের রেজাউল করিম, গোবাতলা মহিপুর এলাকার আব্দুল বারীর সঙ্গে।

গোবরাতলার আব্দুল বারী বলছিলেন, ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের ভোট একটা বিরাট ফ্যাক্টর। এ ছাড়া নতুন ভোটারও একটা ফ্যাক্টর। এই আসনে এবার বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে হাড্ডাহাড্ডি। সুষ্ঠু ভোট হলে যে কেউ জিততে পারে।

শহিদুল ইসলাম বলেন, এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের দুই প্রার্থী পদ্মা নদীর ভাঙ্গন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস এবং চরাঞ্চলের উন্নয়নে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। দিয়াড় অঞ্চলে বিএনপির ‘ভোট দুর্গে’ এবার ভাগ বসাতে চাচ্ছে জামায়াত।

জুবায়ের বলেন, সংসদ নির্বাচনে গ্রামের মানুষ প্রতীক দেখে ভোট দেন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকায় আওয়ামী লীগের কিছু ভোটার বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীকে ভোট দেবেন। সেটা যার পক্ষে বেশি যাবে তার বেশি লাভ হবে।

পুরাতন বাজারের আবু তালেব বলেন, ভোটের সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হত। এখন ব্যবসা বাণিজ্য হারিয়ে যাচ্ছে। এমন প্রার্থীকে ভোট দেব যেন ভালোভাবে দেশ চালাবে। ব্যবসা বাণিজ্যের ভালো হবে। জিনিসপত্রের দাম কমাবে।

নিখিল চন্দ্র কর্মকার বলেন, ভোটের পরিবেশ ভালো থাকলে ভোট দিতে যাব। আমরা শান্তিতে থাকতে চাই।

আমনুরা এলাকার রেজাউল করিম বলেন, যেই দল সরকার গঠন করতে পারবে, দেশ চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে- আমরা সেই দলের প্রার্থীকে ভোট দেব।

যা বলছেন দলের নেতারা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম জাকারিয়া বলেন, বিএনপি গণমানুষের দল। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বেই আগামী বাংলাদেশ গড়তে ধানের শীষের প্রতি মানুষের সমর্থন রয়েছে।

জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির আবুজার গিফারী বলেন, তিনটি আসনেই জামায়াতের বিজয়ের সম্ভাবনা আছে বলে মনে করছি। নির্বাচনি প্রচার তৎপরতা চলছে আমাদের। এখন পর্যন্ত নির্বাচনি পরিবেশে বড় কোনো সমস্যা হয়নি। তিনটি আসনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান ও উন্নয়নের জন্য নানামুখী পরিকল্পনার কথা ইস্তেহারে আমরা তুলে ধরেছি। যুবকদের কর্মসংস্থান, নারীদের সুযোগ-সুবিধাসহ মানুষের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে মানুষের আগ্রহ বেশি।

জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৪৭৯ জন। এরমধ্যে নারী ২ লাখ ৩১ হাজার ৮৩১ ও পুরুষ ২ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৮ জন। তরুণ ভোটার রয়েছেন ৭ হাজার ৯৭৪ জন। এ আসনে ১৭২টি ভোটকেন্দ্রের ৯২৮টি কক্ষে ভোটগ্রহণ করা হবে। 

এম.এ.এ/আ.আ


মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর