দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে রাজনীতির সদিচ্ছা অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন, শিক্ষার আধুনিকায়ন, দুর্নীতি দমন এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। এছাড়া মেধাবী প্রজন্মকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্যও প্রয়োজন উপযুক্ত নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ।’
শনিবার (২৯ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫: অর্থনীতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ছোট একটি জমি, যেখানে ১৮ কোটি মানুষ বাস করছে। এত বেশি জনসংখ্যা এত ছোট জায়গায় পৃথিবীর আর কোথাও নেই। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে হলে পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। যদি পরিকল্পনা না থাকে, ১৮ কোটি মানুষকে জনসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব নয়।
জামায়ার আমির উল্লেখ করেন, ২৫ ভাগ মানুষ প্রাথমিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে ড্রপআউট হয়ে যায়। প্রান্তিক মানুষদের সন্তান স্কুলে বা মাদরাসায় যায় না, দুই-একটি ক্লাস পড়ার পর জীবিকার তাগিদে কাজে যুক্ত হয়। এতে তাদের মেধা দেশের কাজে কাজে লাগেনি। তবে তাদের মধ্যেও ভবিষ্যতের অর্থনীতির বড় অবদান রাখতে পারার সম্ভাবনা থাকে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বা চিফ এক্সিকিউটিভ হতে পারে এমন মানুষও ড্রপআউট হয়ে যাচ্ছেন। এ সমস্যা সমাধান করা সরকারের ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব। তবে তা হচ্ছে না, ফলে অর্থনীতির অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত। উদ্যোক্তা নতুন কোনো ইন্ডাস্ট্রি শুরু করতে গেলে প্রথমে জমি নিতে হয়। কিন্তু সে হাজারো জটিলতায় বাধাপ্রাপ্ত হয়। এক মাসে সব ক্লিয়ার করতে চাইলেও এক বছরও সময় লাগে। কিছু ক্ষেত্রে দুর্বৃত্ত সহযোগিতা করে, রাষ্ট্রও নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করে। এতে উদ্যোক্তার পরিকল্পনা দেরিতে বাস্তবায়িত হয়।
শফিকুর রহমান বলেন, উদ্যোক্তারা ব্যাংক লোন নিয়েছে, কিন্তু যদি লোনের যথাযথ ব্যবহার না হয়, তা নন-পারফর্মিং হয়ে যাবে। সমাজের পক্ষ থেকে দুর্নীতি ও লালফিতার হুমকি ব্যবসায়ীদের প্ররোচিত করছে না। তাই আমাদের ব্যবসায়িক পরিবেশকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা করতে পারে। তিনি বলেন, এটি শুধু বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য নয়, দেশের সকল উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীর জন্য প্রয়োজন।
জামায়াত আমির বলেন, অনেক সময় ব্যবসায়ীদের সুবিধাবাদী বলে মনে করা হয়। কেউ সরকারের সঙ্গে লাইন দেয় নিজের ইচ্ছায়, কেউ বাধ্য হয়ে। কিন্তু লাইন ছাড়া ব্যবসা এগোতে পারছে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাজনীতিবিদ ছাড়া কোনো অর্থনীতি ঠিকভাবে চলতে পারে না। রাজনীতি যদি ঠিক থাকে, ব্যবসা ও অর্থনীতি উন্নতি করতে পারে। দেশে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা ও সুষ্ঠু ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এখন তা তৈরি করা প্রয়োজন।
তিনি তিনটি মূল ফোকাস উল্লেখ করে বলেন, প্রথম শিক্ষা-শিক্ষা শুধু সার্টিফিকেট নয়, প্রফেশনাল শিক্ষা হতে হবে। প্রত্যেক মানুষকে তার ক্ষেত্রে দক্ষ ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কৃষক হলে স্কিল কৃষক, শিল্পী হলে স্কিল শিল্পী। দ্বিতীয়, দুর্নীতি—সমাজে দুর্নীতি ব্যাপক, যা দমন করা প্রয়োজন।
জামায়াত আমির বলেন, যদি হেলদি পরিবেশ তৈরি করা যায়, সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করবে। তৃতীয়, ন্যায়—ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা গেলে ব্যবসা স্থিতিশীল হবে, দেশ প্রগ্রেসিভ ও ডাইনামিক হবে। দেশকে ভালোর দিকে এগিয়ে নিতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। এটি ঠিক হলে সমাজও ঠিক হবে। পরিবর্তন একদিনে হবে না, তবে ধাপে ধাপে আসবে।
তিনি দেশকে এগিয়ে নিতে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। আগামী প্রজন্মের জন্য ভালো কিছু করার দায়িত্ব এখনই নিতে হবে।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাংলাদেশি মেধা সফলভাবে অবদান রাখছে। আমাদের দেশে জন্ম নেওয়া শিশু বিদেশে গিয়ে নিজেকে প্রকাশ করছে। দেশে কেন তা সম্ভব হচ্ছে না? দেশে পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে মেধাবীরা দেশে ফিরে আসতে পারে। তারা দেশের উন্নয়নে নেতৃত্ব দিতে পারবে।
শফিকুর রহমান বলেন, অনেক ছাত্র বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে, কিন্তু ফিরে আসে না। এ কারণ হলো দেশ তাদের যথাযথ সম্মান ও নিরাপত্তা দিতে পারছে না।
ডেস্ক/ই.ই
মন্তব্য করুন: