[email protected] ঢাকা | বুধবার, ২রা সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ই ভাদ্র ১৪৩৩
thecitybank.com

ডেঙ্গুর হটস্পট চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী বিভাগে আগস্টে মোট আক্রান্ত ১৮৭৪ জন

নিজস্ব প্রতিনিধি:

প্রকাশিত:
১ সেপ্টেম্বার ২০২৬, ১৯:১৩

ছবি: সংগ্রহীত

রাজশাহী অঞ্চলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনকহারে বেড়েছে। বিভাগের আট জেলা ও তিনটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগস্ট মাসে ১ হাজার ৮৭৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে আট জেলায় ১ হাজার ৩৩৯ জন এবং তিনটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫৩৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিভাগের আট জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এই জেলা ডেঙ্গুর হটস্পট। অন্যদিকে তিনটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন রাজশাহীতে। এ সময়ের মধ্যে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে স্বস্তির খবর হলো, এত রোগীর মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা এখন পর্যন্ত দুজন।

জেলা সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর চিকিৎসকদের রোগীর বাড়তি চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে হাসপাতালগুলোর ওয়ার্ড ছাপিয়ে বাইরের কলিডোরে রোগীর ঠাঁই হচ্ছে। ফলে হাসপাতালের করিডোরে মশারি টানিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। কোনো কোনো হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী বিবেচনায় অস্থায়ীভাবে বাড়ানো হয়েছে শয্যা।

ডেঙ্গু আক্রান্ত সিফাত রানা বলেন, ডেঙ্গু পজিটিভ হয়ে ৫ দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। হাসপাতলের ডাক্তার ও নার্সদের চিকিৎসা সেবা ভালো। তবে হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশ থেকে শুরু করে বাইরের অবস্থা অনেকটা অস্বস্তিকর। অসুস্থ মানুষ চিকিৎসা নিতে এসে যদি হাসপাতালের পরিবেশ, অপরিচ্ছন্নতা ও নানা ভোগান্তির মুখোমুখি হন, তাহলে সুস্থ হওয়ার বদলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে বলে মনে করি।

২৫০ শয্যার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের আরএমও ডা. মাহবুব হাসান বলেন, বৃষ্টিপাতের কারণে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালের ডেঙ্গু কর্নার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য উপকরণ মজুত রাখা হয়েছে। চিকিৎসক সংকটের মধ্যেও রোগীদের যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। আক্রান্ত রোগীর বেশি অংশ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এছাড়া গুরুতরদের রাজশাহীতে হস্তান্তর করা হচ্ছে।

১ আগস্ট থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ সমান নয়। কোথাও রোগীর সংখ্যা কয়েকশ ছাড়িয়েছে, আবার কোনো কোনো জেলায় এখনো আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম। কিন্তু স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এখনই এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা না গেলে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে- আট জেলার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আক্রান্ত ৬৪৩ জন, সিরাজগঞ্জে ৩৬৩ জন, বগুড়ায় ১৬৫ জন, নওগাঁয় ৪১ জন, নাটোরে ৫৬ জন, পাবনায় ৪২ জন, রাজশাহীতে ২৫ জন ও জয়পুরহাটে ৪ জন আগস্টজুড়ে আক্রান্ত হয়ে সেবা নিয়েছেন। অপরদদিকে, বিভাগের তিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২২৮ জন। এরমধ্যে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮৮ জন এবং সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২১৯ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।

বেশি রোগী চিকিৎসা নেওয়া রামেক হাসপাতালের আগস্ট মাসের ডেঙ্গু পরিস্থিতির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে- মাসের শুরুতে হাসপাতালে ডেঙ্গুতে চিকিৎসাধীন রোগী ছিলেন ৮ জন, যা ৩০ আগস্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ জনে। অর্থাৎ এক মাসে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৪২ জন বা ৫২৫ শতাংশ। ১ থেকে ৩০ আগস্টের মধ্যে ২৫ আগস্টের তথ্য বাদে মোট ২৯ দিনের হিসাবে নতুন করে ২২১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১৭৬ জন। ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে দুইজনের।

মাসের প্রথম ১৫ দিনে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছিলেন ৮৫ জন, বিপরীতে ১৬ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ১৩৬ জন। যা প্রথমার্ধের তুলনায় ৫১ জন বা প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। এই মাসে এক দিনে সর্বোচ্চ ১৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন ২৯ আগস্ট। ওই দিনই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০ জনে পৌঁছায়। তবে পরদিন ২১ জন ছাড়পত্র পাওয়ায় চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা কমে ৫০ জনে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ২৬ থেকে ৩০ আগস্ট-এই পাঁচ দিনে নতুন করে ৬০ জন রোগী ভর্তি হওয়ায় মাসের শেষ দিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ে।

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামিম আহমেদ বলেন, রোববার (৩০ আগস্ট) সন্ধ্যায় ডেঙ্গুতে আব্দুল হান্নান (৩৯) মৃত্যুবরণ করেন। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা। এরআগে গেল ১১ আগস্ট আরও একজন ডেঙ্গুতে মৃত্যুবরণ করেন। সবশেষ সোমবার (৩১ আগস্ট) গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে নতুন করে ২৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময় ১৭ জন রোগী ছাড়পত্র পেয়েছেন। এ ছাড়া বর্তমানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী বিভাগের আট জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তার পরের অবস্থানে রয়েছে সিরাজগঞ্জ জেলা। সীমান্তবর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জে রোগীর এমন সংখ্যা স্থানীয় পর্যায়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। অন্যদিকে সিরাজগঞ্জেও সমানসংখ্যক রোগী পাওয়া যাওয়ায় জেলার শহর ও গ্রামীণ এলাকাগুলোতে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. একেএম শাহাব উদ্দিন বলেন, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা তথ্য অফিসের সহোযোগিতায় মাইকিং কার্যক্রম চালু আছে। প্রতিটি মসজিদে জুম্মার দিনে ইমামদের মাধ্যমে মুসল্লিদের মাঝে সচেতনতামূলক প্রচারণাও চালানো হচ্ছে। আশা করছি সাধারণ মানুষ সচেতন হলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমতে পারে।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো এলাকায় ব্রেটো সূচক ২০-এর বেশি হলে সেটি ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সর্বশেষ জরিপে রাজশাহীর সূচক ৬১ দশমিক ৩৩ হওয়ায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এ অবস্থায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এম.এ.এ/আ.আ


মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর