প্রকাশিত:
২৩ সেপ্টেম্বার ২০২৬, ২১:৩৭
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম আজ। রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে পালিত এ ধর্মীয় স্মরণানুষ্ঠানে গভীর শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে ইসলামের ইতিহাসের প্রভাবশালী আলেম, ধর্মীয় বক্তা ও সুফি সাধক হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-কে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর অনুসারীরা কোরআন তিলাওয়াত, ফাতেহা, দোয়া, মিলাদ, ওয়াজ ও ধর্মীয় আলোচনার মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করছেন।
‘ইয়াজদাহম’ একটি ফারসি শব্দ, যার অর্থ এগারো। সেই অর্থে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম হলো রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে অনুষ্ঠিত ফাতেহা বা স্মরণানুষ্ঠান। সুফি ঐতিহ্যে দিনটি আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর ওফাতের স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ঐতিহাসিক সূত্রে তাঁর ওরস ১১ রবিউস সানিতে পালনের ঐতিহ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। এবারের ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম উপলক্ষে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ ছুটি রয়েছে।
আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) আনুমানিক ৪৭০ হিজরি বা ১০৭৭-৭৮ খ্রিস্টাব্দে গিলান অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে, ৪৮৮ হিজরি বা ১০৯৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি বাগদাদে যান এবং সেখানে হাম্বলি ফিকহসহ ইসলামী জ্ঞানচর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি একজন খ্যাতিমান হাম্বলি আলেম, ধর্মীয় বক্তা ও সুফি শায়খ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
গিলান থেকে বাগদাদে তাঁর যাত্রাকে ঘিরে মুসলিম সমাজে একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি রয়েছে। বলা হয়, তাঁর মা তাঁকে বিদায়ের সময় সত্যবাদী থাকার উপদেশ দিয়েছিলেন। পথে ডাকাতদলের মুখোমুখি হয়েও তিনি নিজের কাছে থাকা অর্থের কথা গোপন করেননি। তাঁর সত্যবাদিতায় ডাকাতদের মধ্যে অনুশোচনা সৃষ্টি হয় এবং তারা পরিবর্তিত হয়—এমন বর্ণনা সুফি জীবনী সাহিত্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। তবে এই ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিতভাবে যাচাই করা কঠিন। ফলে এটি আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর জীবনকে ঘিরে গড়ে ওঠা নৈতিক ও ভক্তিমূলক ঐতিহ্যের একটি পরিচিত কাহিনি হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাগদাদে জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি তাঁর জীবনে দীর্ঘ আধ্যাত্মিক সাধনার একটি অধ্যায় ছিল। গবেষণামূলক ঐতিহাসিক সূত্রে বলা হয়েছে, তিনি প্রায় ২৫ বছর ইরাকের মরুভূমি ও নির্জন পরিবেশে সাধনা ও নির্জন জীবন কাটান। এরপর ১১২৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি বাগদাদে ফিরে এসে প্রকাশ্যভাবে শিক্ষা ও ধর্মীয় উপদেশ দেওয়া শুরু করেন। তাঁর বক্তৃতার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁর শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হয়।
তাঁর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বাগদাদে একটি মাদরাসা ও রিবাত প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে তিনি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের কাছে ধর্মীয় জ্ঞান, নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দিতেন। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১১৩৩-৩৪ খ্রিস্টাব্দে তাঁর পরিবার ও শিক্ষার্থীদের জন্য মাদরাসার সঙ্গে একটি রিবাতও প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর বক্তব্য তৎকালীন ইরাকি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের ওপর প্রভাব ফেলেছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর শিক্ষার কেন্দ্রে ছিল মানুষের অন্তরের সংশোধন ও নৈতিক চরিত্র গঠন। জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি অহংকার থেকে মুক্ত থাকা, আত্মসংযম, ধৈর্য, সত্যবাদিতা, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা এবং মানুষের প্রতি দায়িত্বশীলতার ওপর তিনি গুরুত্ব দিতেন বলে তাঁর শিক্ষা ও পরবর্তী সুফি ঐতিহ্যে প্রতিফলিত হয়েছে।
আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর জীবনের সঙ্গে বহু কারামত বা অলৌকিক ঘটনার বর্ণনাও জড়িয়ে আছে।
তাঁর নামে পরিচিত ফুতুহুল গায়ব এবং আল-গুনইয়াসহ বিভিন্ন রচনা পরবর্তী সময়ে সুফি চিন্তা ও আধ্যাত্মিক শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর নাম ও শিক্ষাকে কেন্দ্র করে কাদেরিয়া সুফি তরিকা বিস্তার লাভ করে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে এ ঐতিহ্য ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে পশ্চিম আফ্রিকা, ভারত ও ইন্দোনেশিয়াসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুসারী তৈরি করে।
আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) ৫৬১ হিজরি বা ১১৬৬ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর সমাধি পরবর্তী সময়ে মুসলিম বিশ্বের সুফি-অনুরাগীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ জিয়ারতের স্থান হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক সূত্রে বলা হয়েছে, তাঁর সমাধি ১২৫৮ সালের মঙ্গোল আক্রমণের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরবর্তীতে পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং আজও তা বিভিন্ন দেশের দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম উপলক্ষে বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা, খানকা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কোরআন তিলাওয়াত, ফাতেহা, দোয়া, মিলাদ, ওয়াজ ও আধ্যাত্মিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর অনুসারীরা তাঁর জীবন, জ্ঞানচর্চা, সাধনা ও নৈতিক শিক্ষার বিভিন্ন দিক স্মরণ করেন। অনেকের কাছে দিনটি আত্মশুদ্ধি, তওবা, নৈতিক জীবনচর্চা এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার অনুপ্রেরণারও একটি উপলক্ষ।ইতিহাসের বিচারে আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) ছিলেন দ্বাদশ শতকের বাগদাদকেন্দ্রিক একজন গুরুত্বপূর্ণ হাম্বলি আলেম, ধর্মীয় বক্তা ও সুফি শায়খ। আর সুফি ঐতিহ্যে তিনি ‘গাউসে আজম’, ‘বড় পীর’সহ বিভিন্ন সম্মানসূচক উপাধিতে স্মরণীয়। তাঁর মৃত্যুর প্রায় নয় শতাব্দী পরও তাঁর নামকে কেন্দ্র করে যে আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, শিক্ষা ও ভক্তি টিকে আছে, ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম সেই দীর্ঘ উত্তরাধিকারেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মরণদিবস।ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম তাই শুধু একজন সুফি সাধকের স্মরণে একটি দিন নয়; তাঁর অনুসারীদের কাছে এটি সত্যবাদিতা, আত্মসংযম, বিনয়, ধৈর্য, জ্ঞানচর্চা ও মানবকল্যাণের শিক্ষাকে নতুন করে স্মরণ করার একটি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক উপলক্ষ।
আ.আ
মন্তব্য করুন: