প্রকাশিত:
১৭ আগষ্ট ২০২৬, ১৭:৩৯
সকাল হতেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সোনামসজিদ স্থলবন্দরের মহাসড়কে কোলাহল বাড়ে। ভারত থেকে সারিবদ্ধভাবে ঢুকতে শুরু করে পাথর বোঝাই শত শত ট্রাক। আর এই ভারী যানগুলোর হর্ণের শব্দ আর উড়তে থাকা ধুলাবালির মাঝেই শুরু হয় একদল স্থানীয় নারীর প্রাত্যহিক জীবনসংগ্রাম। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি কিংবা বড় কোনো ব্যবসা নয়, শুধু ভারত থেকে আসা ট্রাকের খাঁজে আটকে থাকা বা রাস্তায় পড়ে যাওয়া পাথর কুড়িয়েই চলে তাদের জীবিকা। সোনামসজিদ স্থলবন্দর এলাকায় স্থানীয় অনেক দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত নারী এই পাথর কুড়িয়ে তাদের সংসারের চাকা কোনোমতে সচল রেখেছেন।
বন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই পথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ থেকে ২০০টি ট্রাকে পাথর আমদানি করা হয় এবং গত ছয় মাসে যার পরিমাণ ছিল প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন। ভারত থেকে ট্রাকগুলো বন্দরে প্রবেশের সময় অতিরিক্ত বোঝাই বা ঝাঁকুনির কারণে রাস্তায় পাথর পড়ে যায়। এছাড়া ট্রাকের বডি কিংবা খাঁজেও আটকে থাকে ছোট-বড় পাথর। বাংলাদেশে ট্রাক ঢোকার সাথে সাথেই স্থানীয় নারীরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সেই পড়ে যাওয়া বা আটকে থাকা পাথর সংগ্রহ করতে শুরু করেন। সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে এবং ধুলাবালির মধ্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে একেকজন নারী কয়েক কেজি পাথর জমা করেন।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্থলবন্দর এলাকায় ভারতে যাওয়ার জন্য কিছু লোকজন অপেক্ষা করছে। আবার বন্দরের শ্রমিকেরা নিজেদের কাজে ব্যাস্ত আছে। আর তিনজন মহিলা বসে খোশ গল্প করছেন। কিছু ক্ষণ ভারত থেকে পাথর বোঝাইকৃত গাড়ী আসতে দেখে গল্প শেষ করে উঠে দাঁড়াই তারা। তারপর নেমে পড়েন পাথর সংগ্রহের কাজে। ট্রাকগুলোর বডির বিভিন্ন খাঁজে, চাকার খাঁজে পড়ে থাকা পাথরের নুড়িগুলো ছোট বাশের লাঠি দিয়ে তাদের ডালিতে নিচ্ছেন। চেকপোস্টে দুই থেকে তিন মিনিট দাড়ায় ট্রাক গুলো । এর মধ্যেই তাদের কাঙ্খিত পাথর সংগ্রহ করে তারা।
পাথর সংগ্রহকারী ডলি বেগম বলেন, আমরা চারটা ছেলে মেয়ে। স্বামী মারা গেছেন। এই কাজে আমি নামতাম না। কিন্ত চারটা ছেলে মেয়ের জন্য এই পথে নামতে হলো। আজ ১৬-১৭ বছর পাথর কুড়িয়ে খাই এবং এটা করেই সংসার চালাই। আমি স্বামী মারা যাওয়ার পর আমাকে তো সংসার চালাতে হবে তাই বাধ্য হয়েই আমি পাথর কুড়ানোর কাজে নামি। লজ্জা করি না পেট তো চালাতে হবে, দুইটা ডাল আলু ভাত খাওয়ার জন্যই এই কাজটা করি। দিনে ৫০ থেকে ১০০ টাকা আয় হয়। সকাল ১০ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত কাজ করি।
সেফালি বেগম নামে আরেকজন বলেন, আমরা এখানে প্রায় ৩০ বছর যাবত কাজ করে খাই। ছেলে-মেয়েদের কষ্ট দেখতে না পেরে আমরা এই পথে নেমেছি। দিনে ৫০ টাকা হয় আবার সময়তে ১০০ টাকাও হয় ইনকাম। আমরা প্রথমে ট্রাক থেকে পাথর গুলো সংগ্রহ করি তারপর গ্রামের লোকের কাছে বিক্রি করি।
শিরিন বেগম নামের আরেকজন বলেন, পরিবার ও ছেলে মেয়েদের কষ্ট দেখতে না পেরে আমি পাথর কুড়াতে নেমেছি। এখানে পাথর কুড়িয়ে যা টাকা পাই ত দিয়ে সুখ করে দুটা ভাত খেতে পাই। কার দিকে তাকাবো আর হাত পেতে সাহায্য চেয়ে খেলে কি ভালো হবে? তার থেকে পাথর কুড়িয়ে খাচ্ছি। লজ্জা করে তো আর কেউ খেতে দিবে না। কোন দিন দুই ডালি আবার কোন দিন তিন ডালি পাথর পাই। সেগুলো এখানে জমা রাখি। পরে একসাথে বিক্রি করি। তবে এখন এই বন্দর দিয়ে গাড়ি কম ঢুকছে। ফলে আয় কম। সকাল থেকে বসেই আছি।
ভ্যানচালক আলমগীর বলেন, আমি প্রায় এখানে আসি ভাড়া নিয়ে। তাদেকে পাথর কুড়াতে দেখতে পাই। তার গরীব মানুষ। তারা খুবাই সমস্যার মধ্যে আছে। তাদেরকে যেন সরকার কিছু দান অনুদান দেয়। এই দাবি জানাচ্ছি।
বন্দরের পাশের চা বিক্রেতা সেলিম বলেন, আমি এখানেই চা বিক্রি করি। ভারত থেকে যে ট্রাকবাহী মালগুলো আসে। এখানে কিছু স্থানীয়রা আছে তার পাথর কুড়ায়। গাড়ি থেকে, চাকা থেকে। পাথর গুলো কুড়িয়ে এক জায়গাতে পালা করে রাখে। বেশি কিছু পাথর যখন জমা হয় তখন সেগুলোকে বিক্রি করে। এই টাকা দিয়ে চাউল ডাউল কিনে সংসার চালাই। এইভাবেই তারা দিনপার করে। তারাকে তো কেউ সহোযোগিতা করে না। তাদেরকে সহোযোগিতা করলে তার কেন এখানে পাথর কুড়াবে? তাই এখানকার গন্যমান্য ব্যাক্তিদের কাছে তাদের জন্য সহোযোগিতার জন্য দাবি জানাচ্ছি।
এম.এ.এ/আ.আ
মন্তব্য করুন: