[email protected] ঢাকা | মঙ্গলবার, ১৬ই জুন ২০২৬, ১লা আষাঢ় ১৪৩৩
thecitybank.com

পদ্মার দুর্গম চরে চীনা বাদামের ‘বাম্পার’ ফলন, চরাঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিনিধি:

প্রকাশিত:
১৫ জুন ২০২৬, ১৭:৩২

দুর্গম পদ্মার চরে চীনা বাদাম পরিচর্চা করছেন একজন প্রান্তিক চাষী। ছবি: চাঁপাই জার্নাল

যেখানে বছরের পর বছর শুধু ধু-ধু বালু আর মরুভূমির মতো পতিত জমি পড়ে থাকত, সেখানে এখন সবুজ পাতার নিচে দুলছে কৃষকের স্বপ্ন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আলাতুলি ইউনিয়নের রাণিনগরে পদ্মা নদীর জেগে উঠা দুর্গম চরে এবার চীনা বাদামের বাম্পার ফলন হয়েছে। ‘বিনা’ (বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট) ও স্থানীয় কৃষি অফিসের যৌথ উদ্যোগে এবং উন্নত জাতের বীজ ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে গেছে এই চরাঞ্চলের চিত্র।

কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় কৃষকদের সূত্রে জানা গেছে, চলতি রবি মৌসুমে এই চরের প্রায় ১১০০ থেকে ১৫০০ বিঘা অনাবাদী জমিতে চীনা বাদামের চাষ হয়েছে। অন্য কোনো ফসল না হওয়া এই পতিত জমিগুলো এখন স্থানীয় কৃষকদের অর্থনৈতিক মুক্তির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নতুন জেগে উঠা চরে ধু ধু বালু। যে দিকে চোখ যায় সেদিকে শুধু ধু ধু বালুচর তার উপর ছড়িয়ে বিছিয়ে আছে চীনা বাদামের সবুজ সমোরহ। কৃষকরা তাদের ফসল ঘরে তুলতে পার করছেন শেষ সময়ের ব্যাস্ততা। কৃষকরা জানান, পতিত এই চর আগে পদ্মা নদীতে ডুবে ছিল। যার ফলে তারা কোন ফসল ফলাতে পারতো না। নতুন করে জেগে উঠায় এবং বীনা ও কৃষি অফিসের সহোযোগিতা ও পরামর্শে তারা এই ফসল চাষ করে ভালো সফল্য পেয়েছে। তাদের ভাষ্য, আবহাওয়া অনূকুলে থাকলে এবং নায্য  মূল্য পেলে ভালো লাভবান হবেন কৃষকরা। আগামীতে এই চীনা বাদাম চাষে বীনা ও কৃষি অফিস থেকে আরোও সার্বিক পরামর্শ ও সহোযোগিতার দাবিও জানান তারা।

স্কুল শিক্ষক ও বাদাম চাষী মহব্বত আলী বলেন, নতুন জেগে উঠা চড়ে অনাবাদি পতিত জমিতে, যে জমিতে আগে কোন ফসল হতো না, আগে শুধু মরুভূমি হয়ে পড়ে থাকতো, সেই মরুভূমিতে (দুর্গম চর) বিনা অফিসের সহোযোগিতায় সার, বীজ ও কিটনাশনক এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যাবহার করি। আমরা এই বাদাম চাষ করে খুব লাভবান হয়েছি। আমাকে দেখে এই গ্রামের ও ইউনিয়নের অনান্য লোকজনও  (কৃষক) খুব উৎসাহিত। এই বাদাম চাষে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে এবং বিক্রি করে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পাবো। এতে লাভ হয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। আমাদের এই এলাকায় প্রায় ১০০০ থেকে ১৫০০ বিঘা জমিতে বাদাম চাষ হচ্ছে। সামনে আমরা আরোও অগ্রগতি চাই যাতে করে, যাতে করে এলাকাবাসী আরোও উদ্ধুদ্ধ হয় এবং অনাবাদি জমিতে বাদাম চাষ করে লাভবান হয়। যাতে করে তাদের সংসার ভালো ভাবে চলতে পারে।

বাদাম চাষী মুখলেসুর রহমান বলেন, আমি একজন চীনা বাদাম চাষী। বাদাম চাষ করতে বিঘা প্রতি আমাদের প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। এতে আমাদের ৩০ হাজার মতো লাভ হয়। এই জমিতে আমাদের অন্য কোন ফসল চাষ হয় না। আগে পতিত পড়ে ছিল। বিনা অফিসের সহোযোগিতায় আমরা এই অফিস থেকে অনেক সার কীটনাশক সহোযোগিতা পেয়েছি। বিনা অফিস থেকে আরোও সহোযোগিতা চাই যাতে করে আগামীতে আমরা আরোও বেশি বেশি করে চাষ করতে পারি।

আরেক চাষী বেলাল আলী বলেন, আমরা বীনা কৃষি অফিস থেকে বীজ পাই। বিনা-৪, বিনা-৮ এই বীজগুলো উনারা (বিনা অফিস) দেয়। বাদাম চাষ করতে যা যা লাগে আমাদের পরামর্শ দেয় কৃষি অফিস থেকে। তাদের পরামর্শে চাষ করে আমাদের ফসলের ফলন ভালো হয়। আগে আমাদের জমিতে পদ্মার চরে শুধু বালু পড়ে থাকতো। কিন্ত চাষের উদ্যোগ কেউ নেই নি। আমরা দুই ভাই মহব্বত আর আমি ৫ থেকে ৭ বছর থেকে অল্প অল্প করে বাদাম চাষ করি। আমাদের বাদাম চাষ দেখে বর্তমানে এখন গোটা চর ছেয়ে গেছে। কৃষকেরা এখন সবাই বুঝ্যা লিয়্যাছে (বুঝতে পেরেছে)। এখন এই চরে এক হাজার থেকে দেড় হাজার বিঘা জমিতে বাদাম চাষ হচ্ছে। বিঘা প্রতি ৮ থেকে ১০ মণ বাদামের চাষ হবে। এতে করে প্রায় ৩০ হাজার টাকা মতো লাভ হবে। অযথ এই জমিতে কিছু চাষ হতো না বরং বালুতে আমি ৪৫ হাজার টাকা বিঘা প্রতি পাইলাম। তাই এতে আমরা ভালো লাভ, ভালো ‍মুনাফা। ইনশা আল্লাহ এতে আমার ভালো ভাবে সংসার চলে।

সাদিকুল ইসলাম নামের আরেক তরুণ বাদাম চাষী বলেন, চরাঞ্চলে মোহাব্বত আলী ভাইয়ের বাদাম চাষ দেখে আমি বাদাম চাষ করেছিলাম এবং বাদাম চাষে বেশ লাভবান হয়েছি। মোহাব্বত আলী ভাইকে দেখে ও তার দিকনির্দেশনায় অনান্যরাও বাদাম চাষ করেছে এবং বেশ লাভবান হয়েছে। বাদাম এবার বেশ ভালো হয়েছে। আবহাওয়া যদি অনুকুলে থাকে তাহলে আরোও বেশি লাভবান হবো।

আলাতুলি ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল ইকবাল বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আলাতুলি ইউনিয়নের রাণিনগরে পদ্মা নদীর জেগে উঠা নতুন চরে চীনা বাদাম চাষ হয়েছে প্রায় ১১০০ থেকে ১৫০০ বিঘা। এর আগে কখনো এখানে চীনা বাদাম চাষ হতো না। আমাদের কৃষি অফিস ও বিনার উদ্ভোবিত জাতগুলো আমাদের এখানে সরবরাহ করার কারণে কৃষকরা উধ্বুধ্ধ হয়ে চীনা বাদাম চাষ করছে। ধীরে ধীরে তাদের আবাদ বাড়ছে। আমাদের কৃষি অফিসের তত্বাধায়নে আমরা বীজ সরবরাহ করেছি। রোগ প্রতিরোধের জন্য কীটনাশক ছত্রাকনাশক এবং কৃষকদেরকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছি। এই বাদাম চাষ করে কৃষকরাও লাভবান হচ্ছে।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উপ-কেন্দ্র চাঁপাইনবাবগঞ্জের উধ্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আজাদুল হক বলেন, পদ্মা নদীর জেগে উঠা নতুন চরে বাংলাদেশ পরমানু গবেষনা কৃষি ইনস্টিটিউট ও কৃষি অধিদপ্তরের সহায়তায় আমরা কৃষক ভাইদের মাঝে বিনা উদ্ভাবিত জাত বিনা চীনা বাদাম ৬, ৮ ও ১০ এর বীজ বিনামূল্যে বিনার গবেষণা শক্তিশালী প্রকল্পের সহায়তায় বিতরণ করি। বিতরণ করার পর আমাদের কৃষক ভাইয়েরা গত বারের মতো এবারোও চাষ করেছে।  আমরা জমি থেকে দেখে যেটুকু বুঝেছি এইবার বাম্পার ফলন হবে। এছাড়া একজন কৃষক ভাই এক বিঘা বিনা বাদাম চাষ করে বিঘাপ্রতি প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা লাভবান হতে পারে। সেক্ষেত্রে যে জমিতে কোন কিছুই হতো না, বছরের পর বছর পতিত পড়ে থাকতো, সেই জমিতে তারা এক বছরে বাদাম চাষ করে ২০ হাজার টাকা আয় করছে। কৃষি অফিস ও বাংলাদেশ পরমানু গবেষনা কৃষি ইনস্টিটিউট এর সহোযোগিতায় এটা সম্ভব হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে গবেষনা করার পর আমরা ঠিক করি কোন জমিটা পতিত পড়ে আছে। তখন আমরা সরজমিনে পরিদর্শন করে আমরা কৃষক ভাইদেরকে পরামর্শ দিই যে এই জমিতে বাদাম ঐই জমিতে সরিষাসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করতে পারেন। অনেক সময় কৃষক ভাইয়েরা বুঝে উঠতে পারে না কোন জমিতে কী চাষ করতে পারে। কৃষকরা আমাদের কাছ থেকে ভালো একটা ধারনা পায় ফলে আমাদের পরামর্শে তারা উদ্ভোধিত হয় এবং আমাদের কারিগরি টিমের মাধ্যেমে পরামর্শ ও সহোযোগিতা দিয়ে থাকি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ইয়াসিন আলী বলেন, চীনাবাদাম একটি তেল জাতীয় ফসল। এখান থেকে তেল যেমন উৎপাদন করা সম্ভব। এটা সাধারনত বেলে দোঁআশ মাটিতে ভালো হয় এবং চর অঞ্চলের জন্য একটা ভালো উপযোগী ফসল। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের কয়েকটি ইউনিয়নে নতুন করে চর জেগেছে, এইগুলোতে অন্য কোন ফসল চাষ করা যায় না। আমাদের কৃষি সম্প্রসরণের সার্বিক পরামর্শে এই বছরের রবি মৌসুমে বিনা চিনা বাদাম-৪,৬ ও ৮ চাষ করছি। ফসলের অবস্থা ভালো। এখন কর্তন চলছে এবং কৃষকরা এটা চাষ করে বেশ খুশি। আশা করছি তারা ভালো ফলন পাবে এবং আগামী দিনে চিনা বাদামের ফলন সম্প্রসারিত হবে বলে মনে করছি।

এম.এ.এ/আ.আ


মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর