প্রকাশিত:
১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৭:৪৯
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন চরবাগডাঙ্গা। এই ইউনিয়নে মাদক চোরাচালান সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, ভিলেজ পলিটিক্স এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিয়মিত সংঘর্ষ ও ককটেল বাজির ঘটনা ঘটে।
গত শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) এই ইউনিয়নের ফাটাপাড়া এলাকায় ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণে দুই নিহত ও তিনজন আহত হয়। এই ঘটনার পর আবারোও দেশজুড়ে আলোচনায় আসে চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন।
ককটেল বিস্ফোরণে নিহত-২, আহত-৩ এবং মামলা দায়ের:-
সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাটাপাড়ায় ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণের ঘটনায় দুইজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন।
নিহতরা হলেন, সদর উপজেলার রাণিহাটি ইউনিয়নের ওপর ধুমিহায়াতপুর এলাকার মোয়াজ্জেমের ছেলে আলামিন (২০) এবং শিবগঞ্জ উপজেলার ঘোড়াপাখিয়া ইউনিয়নের মনিরুল ইসলামের ছেলে জিহাদ (১৭)।
এছাড়া আহত তিনজন হলেন, সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাঁটাপাড়া গ্রামের মো. বজলুর রহমান (২০) ও মো. মিনহাজ (২২) এবং একই উপজেলার রাণিহাটি ইউনিয়নের উপরধুমি এলাকার মো. শুভ (২০)। তিনজনই রাজশাহী মেডিকেলে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এই ঘটনায় শনিবার রাতে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছে। এই মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ ও ৮ থেকে ১০ জনকে অজ্ঞাত দেখানো হয়েছে। এছাড়া এই ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাটাপাড়া এলাকার চান মোহাম্মদের ছেলে মোহাম্মদ ইউসুফ (৪৫)। এছাড়া রাজশাহী মেডিকেলে চিকিৎসাধীন তিনজনকেও গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এই মামলায়।
এজারহার সূত্রে জানা যায়, মামলার ১নং আসামী বহিস্কৃত চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা শহীদ রানা টিপু মৌখিক নির্দেশ ও অর্থের সহায়তায় মো: কালাম, ইউসুফ আলী, শাকিল আহমেদ, শাহারুল আলম কালু, বজলুর রহমান, মিনহাজ, শুভ, আলামিন ও জিহাদসহ অজ্ঞাতনামা ৮ থেকে ১০ জন এলাকায় নাশকতা মূলক কর্মকান্ড ঘটানোর উদ্দেশ্যে জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি সাধন ও ত্রাস সৃষ্টির লক্ষে ককটেল তৈরির কাজ করছিল। ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণ ঘটলে পলাতক আসামীগন দিক বেদিক পালিয়ে যায় এবং অন্য আসামী আলামিন ও জিহাদ ঘটনাস্থলেই গুরুত্বতর আহত হয়ে মারা যান। এছাড়া বজলু, মিনহাজ ও শুভ গুরুত্বতর আহত হয় এবং বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেলে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
দলীয় রাজনীতির চেয়ে চাঙ্গা ভিলেজ পলেটিক্স:
চরবাগাডাঙ্গা ইউনিয়নে দলীয় রাজনীতির চেয়ে বেশি চাঙ্গা ভিলেজ পলেটিক্স। এই ইউনিয়নের সাধারন জনগণ থেকে নেতারা দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বসবাস করেন। সংসদ বা স্থানীয় নির্বাচন হোক তাদের কাছে দলীয় প্রতীকের চেয়ে গ্রুপিং রাজনীতি বেশি কার্যকরী। গ্রুপ প্রধান যাকে ভোট দিতে বলেই সেদিকেই ঝুঁকে ভোট দেওয়ার হার। মোটাদাগে এই দুই গ্রুপের মধ্যে এক গ্রুপের নেতৃত্ব দেন চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর আলী এবং অপর গ্রুপের নেতৃত্ব দেন চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের বহিস্কৃত চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা শহীদ রানা টিপু। ওমর আলীর গ্রুপে আছে: নুরুল ইসলাম, জুয়েল রানা, নাসির আলী, রফিক মোল্লা, এনামুল, জালাল, আনোয়ার, টিপু সুলতান ও বাবুসহ প্রমুখ। অপরদিকে টিপুর গ্রুপে আছে: আজিজুল, কাদির, মুজিবুর, হযরত, দুলাল ও মিজানসহ প্রমুখ।
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের রাজনীতি দেখাশুনা করতেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ও পলাতক সাবেক এমপি আব্দুল ওদুদ বিশ্বাস। টিপু ও ওমর উভয় গ্রুপই তার অনুসারী হিসেবে কাজ করতো। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পর ওমর আলী আশ্রয় নেন বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদের কাছে। আর শহীদ রানা টিপু ও আজিজুল আশ্রয় খোজে পান জেলা বিএনপির নেতৃত্বের কাছে। তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপি থেকে হারুনুর রশিদ মনোনয়ন পেলে পরবর্তীতে শহীদ রানা টিপুর অনুসারীরা জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে ভোটের প্রচারণা শুরু করেন। এমনকি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে চেয়ে ভোট হয়েছে ওমর আলী ও শহীদ রানা টিপু গ্রুপের মধ্যেই।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা জামায়াতের আমীর হাফেজ আব্দুল আলীম বলেন, চরাঞ্চলে ভিলেজ পলেটিক্স এর মত মিথ্যা ও অসহনীয় বেড়াজালের কারণে সাধারন মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। অধিকাংশ সময় তারা আতঙ্কিত থাকে, ভীতির সাথে জীবন যাপন করে। কিছু অসাধু ব্যক্তির স্বার্থের কাছে সাধারণ মানুষ আজ জিম্মী হয়ে আছে। আমরা পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের অবসান চাই। আমরা প্রশাসনের সহোযোগিতায় জনগনকে সাথে নিয়ে আধিপত্য বিস্তার, মাদক সিন্ডিকেট, ভিলেজ পলেটিক্স ও মামলা বাণিজ্য কার্যক্রম ভেঙ্গে দিবো ইনশা আল্লাহ।
সদর উপজেলা বিএনপির আহবায়ক ওবায়েদ পাঠান বলেন, চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন মাদকের অবৈধ টাকা আর ভিলেজ পলেটিক্স এর কারণে অশান্ত। আমরা এইগুলো আর দেখতে চাই না। চরাঞ্চলে সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক রাজনীতি দেখতে চাই। আর যারা এইসব কর্মকান্ডের সাথে জাড়িত তাদের ব্যাপারে প্রশাসনকে শক্ত হওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
মাদক চোরাচালান সিন্ডিকেটে জনপ্রতিনিধিদের নাম:
সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চরবাগডাঙ্গা দীর্ঘকাল ধরেই মাদক চোরাচালানের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্য জব্দ করলেও সিন্ডিকেটগুলোর তৎপরতা থামছে না। এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে গ্রুপ পলেটিক্স এবং এতে জনপ্রতিনিধিদের নামও জড়িয়েছে।
এই মাদক সিন্ডিকেটের এক গ্রুপে রয়েছে, চরবাগডাঙ্গার বহিস্কৃত চেয়ারম্যান শহীদ রানা টিপু, দুলাল আলী, মিজান এবং অপর গ্রুপে রয়েছে চরবাগডাঙ্গা ইউপি সদস্য নুরুল ইসলাম, ইউপি সদস্য জুয়েল রানা, ইউপি সদস্য মাইনুল, আনোয়ার ও টিপু সুলতান।
জানা গেছে, টিপু গ্রুপের চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের বহিস্কৃত চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা শহীদ রানা টিপু হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে ৯টি মামলার আসামী। এছাড়া মাদকের একাধিক মামলা ছিল তবে পুলিশ রির্পোটে তিনি অব্যাহতি পান। টিপুর ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত আজিজুল আগে আদম ব্যাবসার সাথে জড়িত ছিল। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ব্লক তৈরির ঠিকাদারি কাজ শুরু করেন এবং চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের পদ্মা নদীর বালুমহল সিন্ডিকেটের সাথেও জড়িত সে। এছাড়া হত্যা মামলার আসামীও সে। টিপুর গ্রুপের মিজানও একাধিক মাদক ও হত্যা মামলার আসামী।
অপরদিকে ওমর আলী গ্রুপের ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর আলী অস্ত্র মামলার আসামী ছিল এবং সেই মামলায় তাকে সাজা ও জেলেও যেতে হয়েছিল। সদর উপজেলা তাঁতী লীগের সভাপতি ও ইউপি সদস্য নুরুল ইসলাম ৪টি মাদক ও ১টি বিস্ফোরক মামলার আসামী। আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি সদস্য জুয়েল রানাও ৪টি মাদক মামলার আসামী তার মধ্যে একটিতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এবং পুলিশের খাতায় পলাতক হিসেবে চিহ্নিত রয়েছেন । ইউপি সদস্য মাইনুল ইসলাম ওরফে মাইনুল হাজিও একাধিক মাদক মামলার আসামী বলে জানা গেছে।
ইউপি সদস্য রফিক মোল্লা বলেন, চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নে দলীয় রাজনীতি নয় বরং স্থানীয় নির্বাচন, ভিলেজ পলেটিক্স, মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই দুই গ্রুপের মধ্যে ঝামেলা সৃষ্টি হয়। দুই গ্রুপের মাদকের গডফাদার রয়েছে। তাদের হাতে প্রচুর অবৈধ টাকার কারণে টাকার গরমে মাঝে ককটেল বাজি করে তারা। একটি বোম বানাতে ২০ হাজার টাকা মতো খরচ পড়ে। সাধারন মানুষের দ্বারাতো তা সম্ভব নয়। যাদের কাছে অবৈধ টাকা আছে তাদের দ্বারাই এইসব সম্ভব। তাদের গ্রুপিং এর কারণে সাধারন মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্থ। তাই আমরা চাই এই ঘটনার সাথে কারা জড়িত তাদেরকে খুজে বের করা হোক এবং প্রকৃত অপরাধীদের সঠিক বিচার হোক। কোন নিরাপরাধ মানুষ যেন না ফেসে যায় সেটাই চাই। এছাড়া এলাকার ভিলেজ পলেটিক্স ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ন্ত্রণের জন্য রাজনীতিবিদদের বুলবুল ভাইয়ের সহোযোগিত চাই। প্রশাসনের মাধ্যমে দুই পক্ষকে নিয়ে বসে এই সব বন্ধের ব্যাবস্থা করা হোক। কারণ কয়েকজন ব্যাক্তির জন্য এলাকার দুর্নাম হচ্ছে।
ত্রাস-আধিপত্য বিস্তারে ব্যবহৃত হয় ককটেল:
চরবাগডাঙ্গাসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দিয়ে ভারত থেকে আসে ককটেল তৈরির সামগ্রী। বিজিবি ও অনান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে মাঝে মধ্যে ধরা পড়লেও চালানের বড় অংশই থাকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। মাদক সিন্ডিকেট, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মাঝে মধ্যেই আতশ বাজির মতো চলে ককটেলবাজি। এই এলাকার আম বাগানে ও বাড়ির পাশে পুতে রাখা ককটেল বিস্ফোরিত হতাহতের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি ছোট শিশু ককটেলকে বল ভেবে খেলতে গিয়েও ককটেল বিস্ফোরিত হয়ে আহত হয়েছেন।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে চরবাগডাঙ্গার ইউনিয়নের সীমান্ত এলাকা দিয়ে ৯কেজি ৩০০ গ্রাম বিস্ফোরক জব্দ করা হয়েছে। এই ঘটনায় দুইটি মামলা ও একজন গ্রেপ্তার এবং ছয়জন পলাতক রয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আলি হোসেন বলেন, চরবাগডাঙ্গা এলাকায় ভিলেজ পলেটিক্স, আধিপত্য বিস্তার ও মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের জন্য দুই গ্রুপই ককটেল ফাটিয়ে আতংক সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। ছোট খাটো বিষয় নিয়েই মাঝে মধ্যে ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটে। আমরা এলাকায় শান্তি চায় এবং এসব নৈরাজ্য বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ দেখতে চায়।
যা বলছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী:
৫৩ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সীমান্ত এলাকায় মাদক ও চোরাচালান বন্ধে নিয়মিত টহল চালু আছে। নিয়মিত অভিযানে মাদক দ্রব্য ও চোরাচালান সামগ্রীও ধরা পড়ছে। এছাড়া সীমান্ত এলাকায় সামাজিক সচেতনা বৃদ্ধিতেও কাজ করছে বিজিবি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) এ.এন.এম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, মাদক চোরাচালান সিন্ডিকেট ও আধিপত্যকে ভেঙ্গে দিতে আমাদের নিয়মিত পুলিশিং কার্যক্রম চলছে। ককটেল ও ককটেল উদ্ধারও হচ্ছে নিয়মিত। এছাড়া বিট পুলিশিং এর মাধ্যমে জনগনকে সচেতন করা হচ্ছে। এই কর্মকান্ডের সাথে রাজনৈতিক কোন যোগশত্রুটা নেই। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে সবাইকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাছাড়াও বিস্তারিত তদন্তের জন্য গ্রেপ্তারকৃত আসামীদের রিমান্ড চাইবে পুলিশ।
এম.এ.এ/আ.আ
মন্তব্য করুন: