প্রকাশিত:
২৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১৫:৪৩
চাঁপাইনবাবগঞ্জের বহুল আলোচিত শিবির নেতা শহীদ আসাদুল্লাহ তুহিন হত্যার ঘটনায় প্রায় ৯ বছর পর মামলা দায়ের করেছিলেন তুহিনের আপন মামা মো: কবিরুল ইসলাম। কিন্ত প্রথমে থানায় মামলা নিতে গড়িমসি এবং পরে আদালতের নির্দেশে মামলা নিলেও বছর পার হয়ে গেলেও তার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি পুলিশ। এতে আজ সোমবার (২৬ জানুয়ারি) আসাদুল্লাহ তুহিনের ১১ তম শাহাদাত বার্ষিকিতে শহীদের পরিবার-আত্নীয় স্বজন ও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
মামলার আসামিরা হলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল ওদুদ বিশ্বাস (৫৬), জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ডা. গোলাম রাব্বানী ফটিক (৫৫), জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সাবেক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রুহুল আমিন (৭২), মো. এজাবুল হক বুলি (৫১), মো. মাইনুল ইসলাম (৬০), ডা. ইব্রাহিম আলী (৪২), মো. সোহেল (৩১), বেনজির আহমেদ (৬২), তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর, তৎকালীন র্যাব-৫, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ক্যাম্পের কমান্ডার মেজর কামরুজ্জামান পাভেল, এসআই বিশারুল ইসলাম, এসআই শহিদুল ইসলাম, হাবিলদার খাইরুল ইসলাম, ল্যান্স কর্পোরাল ওমর ফারুক, নায়েক মো. সওদাগর আলী, মো. মাসুম বিল্লাহ, নূর মুহাম্মদ শিকদার, সিপাহী শফিকুল ইসলাম ও এসআই আবু হুরায়রা। এদের মধ্যে ৬ জন আসামী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং বর্তমানে তারা সবাই জামিনে আছেন। এছাড়া বাকিরা পলাতক রয়েছে বলে জানা যায়।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ৯ নভেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানায় মামলার আবেদন করেন শহীদ আসাদুল্লাহ তুহিনের আপন মামা কবিরুল ইসলাম কবির। পরে থানায় মামলা নিতে গড়িমসি শুরু করলে তিনি একই বছরের ২৭ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আমলি আদালতে সাবেক স্বরাষ্টমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ নেতা ও র্যাব কর্মকর্তাসহ ১৮ জন আসামীদের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেন এবং আদালত সদর মডেল থানায় মামলা রুজু করে তদন্তের নির্দেশ দেন। পরে সদর মডেল থানায় মামলাটি রুজু হয় এবং তদন্ত শুরু করেন তৎকালীন সদর মডেল থানার তদন্ত ওসি নুরুল কবির সৈকত। তিনি তদন্ত কার্যভার গ্রহণের পর মাত্র একজনকে আটক করতে পেরেছিলেন। তবে অভিযুক্ত গোলাম রাব্বানী ফটিক, রুহুল আমীন, এজাবুল হক বুলি, মাইনুল ইসলাম ও ইব্রাহীম আলী উচ্চ আদালতে আগাম জামিন নিয়ে পৃথক পৃথক দিনে নিন্ম আদালতে জামিন নিতে আসলে তাদের জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণ করেন আদালত। পরে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে তাদেরকে দুই দিনের রিমান্ডে দেয় আদালত। বর্তমানে তারা সবাই উচ্চ আদালত থেকে জামিনে আছেন। এর পরে সদর মডেল থানার তদন্ত ওসি নুরুল কাদির সৈকত নাচোল থানায় বদলি হয়ে গেলে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান সদর মডেল থানার সেকেন্ড অফিসার রাজু আহমেদ। পরে বছর পার হয়ে গেলেও এই মামলায় তেমন কোন অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রাজু আহমেদ বলেন, মামলাটিতে একাধিকবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে। এছাড়া মামলার আসামীদের অধিকাংশ সার্ভিসধারী। তাই তাদের বতর্মান ঠিকানা ও অবস্থান যাচাই বাছাই করতে সময় লাগছে। এই দুই কারণেই মামলার তদন্তে সময় লাগছে। আদালতকে এই বিষয়গুলো অবহিত করা হয়েছে এবং তদন্ত কাজ সম্পন্ন করার জন্য সময় নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে মামলার বাদি আসাদুল্লাহ তুহিনের মামা কবিরুল ইসলাম কবির বলেন, স্বৈরাচার হাসিনার আমলে আমার ভাগিনা নিমর্মভাবে হত্যার শিকার হয়। সেসময় আমরা মামলা করতে পারিনি। দীর্ঘ নয় বছর পর মামলা করেছি। তবে মামলার তেমন কোন অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। বেশির ভাগ খুনির পলাতক আবার যে কয়জনকে গ্রেপ্তার করেছিল তারাও জামিনে আছে। আমরা দ্রুততার সহিত মামলার অগ্রগতি দেখতে চাই এবং খুনিদের সব্বোর্চ শাস্তি চাই। আপনার আমার ভাগিনার জন্য দোয়া করবেন আল্লাহ যেন তার শাহাদাতকে কবুল করেন এবং তাকে জান্নাত দান করেন।
উল্লেখ্য, মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের ২৬শে জানুয়ারি দুপুর ২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে নিজ বাড়ি থেকে চোখ বেঁধে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় আসাদুল্লাহ তুহিনকে। এ সময় তিনি গাড়িতে উঠতে আপত্তি করলে রাইফেলের বাঁট দিয়ে তাকে বেধড়ক পিটিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায় র্যাব সদস্যরা। রাত আনুমানিক ১০টা থেকে ১টার মধ্যে উল্লিখিত আসামিদের উপস্থিতিতে তৎকালীন চাঁপাইনবাবগঞ্জের নতুন স্টেডিয়ামে অস্থায়ী র্যাব কাম্পে তুহিনকে বেধড়ক মারধর করা হয়। তার কাছে জামায়াত নেতাদের অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আসামিদের প্রচণ্ড মারধরের ফলে তুহিন গুরুতর জখম হয়ে মারা যান। এই মৃত্যুর ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য তুহিনের মরদেহকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের লালাপাড়া এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং রাস্তায় ফেলে গাড়ি চাপা দেয়া হয়। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ যেন উদ্ঘাটিত না হয় সেজন্য তৎকালীন বিএমএ নেতা ডা. গোলাম রাব্বানী ফটিককে দায়িত্ব দেয়া হয় এবং সে চিকিৎসকদের প্রভাবিত করে মিথ্যা ও বানোয়াট সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত রিপোর্ট করানো হয়।
এম.এ.এ/আ.আ
মন্তব্য করুন: