প্রকাশিত:
১০ জানুয়ারী ২০২৬, ২২:০৬
পড়াশোনা শেষ করে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন মামুনুর রশিদ। স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগ নেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে বেসরকারী ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রতিষ্ঠার। কিন্ত ডায়গনস্টিক দেওয়ার জন্য লাগবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেতে দরকার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিস, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। এইসব ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তিনটি অফিসে জমা দেন মামুনুর রশিদ।
তার একদিন পর মামুনুর রশিদের কাছে একটি অজানা নাম্বার থেকে ফোন আসে এবং ফোনের অপর প্রান্তের ব্যাক্তি নিজেকে ডা. সুমন পরিচয় দেন। তিনি জানান, তার সহোযোগিতা না নিলে মিলবে না ডায়গনস্টিকের ছাত্রপত্র। পরে একপ্রকার জিম্মি হয়েই সেই তথাকথিত ডা. সুমনকে মোটা অঙ্কের টাকা বিনিময়ে ছাড়পত্র নেন মামুনুর রশিদ। শুধু মামুনুর রশিদ নন এই সুমন সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বেসরকারি ক্লিনিক ডায়গনস্টিকের মালিকগন। আর সুমনের সহোযোগি হিসেবে কাজ করছেন মিজানুর রহমান মিজান নামের আরেক ব্যাক্তি।
সুমন হলেন চাঁপাইনবাগঞ্জ পৌরসভার বটতলা এলাকার গোলাম নবীর ছেলে এবং তার সহোযোগী মিজানুর রহমান মিজানের বাড়িও একই এলাকায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুমন আলী কখনো নিজেকে চিকিৎসক আবার কখনো নিজেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রাণলয়ে চাকরি করেন এমন পরিচয় দেন ক্লিনিক মালিকদের কাছে। বেসরকারী ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়নসহ যাবতীয় কাজ তিনি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে দীর্ঘদিন যাবত বিপুল পরিমান অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্লিনিক মালিকদের কাছ থেকে। এমনকি চাঁপাইনবাবগঞ্জের বেসরকারী ক্লিনিকগুলোর নবায়নের শেষ মেয়াদ, ক্লিনিকের কাগজপাতির ঘাটতিসহ নানান বিষয়ে আগে থেকেই জানতে পারেন সুমন আলী। পরে সেই মোতাবেক উক্ত ক্লিনিক মালিককে ফোন দিয়ে বা যোগাযোগ করে বিভিন্ন ভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে এক প্রকার জিম্মি করে হাতিয়ে নেন বিপুল পরিমান অর্থ। এছাড়া সরকারি হাসপাতলে নার্স, মেডিকেল টেকনোলিস্ট হিসেবে চাকরি দেওয়া এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে পোস্টিং করে দিবে এমন কথা বলেও অনেক জনের কাছে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।
আরোও জানা যায়, সুমন আলীর ঘনিষ্ঠতা ছিল আওয়ামী সরকারের প্রভাবশালী স্বাচিপ নেতা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (প্রশাসন ও হাসপাতাল) ডা. সামিউল হক সাদির সাথে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ডা. সামিউল হক সাদির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন দুদকের টিম এবং বর্তমানে তিনি পলাতক আছেন বলে জানা যায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের বেসরকারী ক্লিনিক জারা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক মামুনুর রশিদ বলেন, ২০২২ সালে আমি একটি ডায়গনস্টিক সেন্টার দেওয়ার জন্য সিভিল সার্জন অফিসে যায়। সিভিল সার্জন অফিস থেকে কিছু কাগজের রিকুডমেন্ট দেয়। সেগুলো আমি সংগ্রহ করি এবং পরবর্তীতে আমার নাম্বারে একটি ফোন আসে এবং তিনি নিজেকে ডা. সুমন নামে পরিচয় দেয়। তিনি বলেন, সিভিল সার্জন অফিস ঘুরে কোন লাভ নাই। আমার কাছেই এসে লাইসেন্স করতে হবে। একপর্যায়ে তার কাছে জিম্মি হয়ে এবং তার সিন্ডিকেটে পড়ে তার কাছে সব কাগজপাতি জমা দিয়ে লাইসেন্স করতে বাধ্য হয়। এছাড়া একটা মোটা অংঙ্কের টাকার বিনিময়ে সে আমাকে লাইসেন্স করে দেয়। এখন আবার লাইসেন্স রিনিউ করতে গিয়ে আবারোও তার সিন্ডিকেটে পড়তে হচ্ছে। আমরা তার সিন্ডিকেট থেকে মুক্তি চাই।
রুমন নামে আরেক ব্যাক্তি বলেন, আমার বউ সিনিয়ন নার্স পদে চাকরি করেন। সুমন নামের এক প্রতারক কোন মাধ্যমে জানতে পারে আমার বউ দূরবর্তী কোন এক জেলায় কর্মরত আছে। তারপর সে আমাকে ফোন দেয় এবং সে বলে আপনার স্ত্রীকে আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় পোস্টিং করে এনে দিবো। এই বলে আমার কাছ থেকে কিছু টাকা হাতিয়ে নেয় কিন্ত পোস্টিং করে দেয়নি। তাই আমি প্রশাসনের কাছে আবেদন জানায় সুমন নামের এই প্রতারককে যেন আইনের আওতায় আনা হয় এবং কেউ যেন তার কাছে প্রতারিত না হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানান, রাজনৈতিক কারণে আমার পদন্নোতি দীর্ঘ দিন যাবত আটকে ছিল। পরে আমার পদন্নোতি করিয়ে দিবে বলে ০৮ লাখ টাকা দাবী করেন সুমন। এই বিপুল পরিমাণ টাকা দিতে আমি অপারগতা প্রকাশ করি। এরপরে জানতে পারি আমার ব্যাচেরই অনান্য চিকিৎসকরা তার (সুমন) মাধ্যমে পদন্নোতি পেয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে অনান্য চিকিৎসকদের কাছ থেকে কোটি টাকার উপরে হাতিয়ে নিয়েছে এই সুমন চক্র।
বেসরকারী ক্লিনিক মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক ও ল্যাব ওয়ান মেডিকেলের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক মাইনুল ইসলাম ডলার জানান, দু:খের সাথে বলতে হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় যেসব ক্লিনিক আছে সেগুলোর লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন লাইসেন্স নিতে গিয়ে খুবই বিড়ম্বনায় পড়ছি। প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে আমাদের বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। নতুন লাইসেন্স করতে গিয়েও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে এবং নবায়ন করতে গিয়েও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। পরিবেশ, ড্রাগ ও ফায়ার অফিসে গিয়েও ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে। আর এই ঝামেলাগুলো হচ্ছে সুমন নামের এক ব্যাক্তির সিন্ডিকেটের কারনে। তাই এই বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতি ও ড্যাবের জেলার আহবায়ক ডা. ময়েজ উদ্দিন বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শুনতে পাচ্ছি সুমন নামের এক ব্যাক্তির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন আমাদের ক্লিনিক ব্যাবসায়ীরা। আমাদের সমিতির কয়েকজন এসে আমার কাছে তার বিষয়ে অভিযোগ দিয়েছেন। তাদের ভাষ্যমতে সুমন সিন্ডিকেটের কারনে সিভিল সার্জন অফিসসহ অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়ম মাফিক কাজ করতে পারছেন না তারা। এ বিষয়গুলো প্রশাসনের নজরে নেওয়া উচিত এবং সিন্ডিকেট মুক্ত করা উচিত বলে মনে করি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো: আবু সাঈদ জানান, সুমন নামে একজনের কথা আমি শুনেছি। তিনি নাকি আগে অনেকগুলো আবেদন গুলো করেছিল। সেটা আমি জয়েন করার আগের বিষয়। কিন্ত আমি জয়েন করার পর যে আবেদন গুলো সিরিয়ালি আসছে সেই আবেদন গুলো নিয়েই কাজ করা হচ্ছে। কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান বা হাসপাতাল কিংবা ডায়গনস্টিক সেন্টারের ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য উদ্যোক্তাগন এখানে সরাসরি আবেদন করেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে সকল কাগজপত্র চেক করার পর কাগজপত্র সঠিক পাওয়া যায় তাহলে আমরা সরজমিনে পরিদর্শন করি এবং পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করার জন্য বিভাগীয় কার্যালয় বগুড়াতে প্রেরণ করা হয়। সেখানে ছাড়পত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে আমরা অনলাইনে ছাড়পত্র ইস্যু করি। কোন দালাল সিন্ডিকেটের এখানে এসে কোন আবেদন করার সুযোগ নেই।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. এ.কে.এম শাহাব উদ্দিন বলেন, সুমনের সাথে আমাদের কোন যোগাযোগ নেই। আমি এখানে যোগদানের পর সে একবারই আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল এবং আমার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছিলেন। এরপর আর তাকে আমি কখনো দেখিনি। ক্লিনিক ও ডায়গনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নবায়নের জন্য আমাদের টিম আছে। সেই টিম পরিদর্শন করে এবং পরিদর্শন প্রতিবেদন অত্র প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
কাজ করে সুমন, লেনদেন করে মিজান:
সুমনের পূর্ব পরিচিত হওয়ার কারণে এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িয়ে পড়েন মিজানুর রহমান ওরফে মিজান। সুমন চালাক ও চত্তুর হওয়ার কারণে তিনি জনসম্মুখে আসে না বরং আর্থিক লেনদেনের মতো বিষয়গুলো মিজানকে দিয়ে করিয়ে থাকে। এছাড়া সুমনের জমি জায়গার দেখা শুনার কাজও করেন মিজান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাক্তি বলেন, আমি মেডিকেল টেকনোলোজিস্ট চাকরির আশায় সুমননে ৫ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। পরে সুমন আমাকে চাকরি দিতে না পারায় টাকাগুলো ফেরত চাই। কিন্ত সে টালবাহনা শুরু করে। যখনই সুমনকে ফোন দিই তার কিছুক্ষন পর মিজান আমার সাথে যোগাযোগ করতো। পরে সেই সময়ের এক ছাত্রলীগ নেতাকে ধরে আমি টাকাগুলো উদ্ধার করি। টাকা উদ্ধারের সময় মিজান আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছিল এবং সেই টাকাগুলো ফেরত দিয়েছিলো।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মিজানুর রহমান মিজান বলেন, আমি নিজের ব্যাবসা বাণিজ্য নিয়েই ব্যস্ত আছি। সুমনকে এলাকার বড়ভাই হিসেবে চিনি। ব্যাবসা বাণিজ্যের খাতিরে তার কাছে মাঝে মধ্যে টাকা ধার নিই। তবে সে কি কাজ করে তা জানিনা। এছাড়া আমি এইসব কাজের সাথেও জড়িত না।
শূণ্য থেকে কোটিপতি সুমন:
জন্ম সনদ অনুযায়ী সুমনের জন্ম ১৯৯৬ সালে। সে হিসেবে তার বয়স ৩০ এর আশেপাশে। কিন্ত তিনি অতি সাধারন পরিবার থেকে উঠে এসে এই বয়সেই শুণ্য থেকে বনে গেছেন কয়েক কোটি টাকার মালিক। তার রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার জোড়গাছি এলাকায় পৈতিক সম্পদের উপর আনুমনিক এক কোটি টাকায় নির্মিত তিন তলা বিশাল বাড়ি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোবরতলা ইউনিয়নের সরজন মোজায় নাচোল-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের পাশে আনুমানিক ৬ কাঠা জমির উপর নির্মিত বাড়ি ও তার পাশেই চারবিঘা জমিসহ আমের বাগান, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় দুইকোটি টাকা এবং একই ইউনিয়নের বনমথড়া মৌজায় ৮ বিঘা ধানি জমি, যার আনুমানিক মূল্য ৬৫ লক্ষ টাকা। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের গোবরাতলা ইউনিয়নের বনমথরা মোজার ২৯৪, ২৫৪,২৫৬,২৫৭, ২৫৮ নং দাগে ২.৩৬৬৩ একর, সর্জ্জন মৌজার ৮৭২, ৮৭১ নং দাগে .১৮২৩ একর, ৯৫২,৯৫২ নং দাগে ০.০৮০২ একর, বেহুলা মৌজার ১৫২৩ নং দাগে .১৩২০ একর, কোচলাপাড়া মৌজার ১২২১ ও ১৪৯২ দাগে .০৬৬০ একর, আচুয়া মৌজায় ২২৮ নং দাগে .৪৪৮৭ একর, দমদমা মৌজায় ১২৩,১২৪,১৩৮,১২৯,১৩০,১৩১, ১৩২, ৩৫৬ দাগে ১.০৫৫৯ একর , চাঁপাই মৌজার ৬৮১ দাগে .০৪১৩ একর, দোয়াপুর মৌজার ৮৫, ৭৭, ৩২৫, ৩২৬, ৩২৭,৩৩৩,৩৬৬ দাগে .৩১৭৫ একর ও নরসিংহল মৌজার ২ নং দাগে ০.৪৯৫০ একর জমি রয়েছে। যার দাম কয়েক কোটি টাকা। এছাড়া নাচোল উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় তার নামে এবং সুমনের ক্রয়কৃত জমি তার স্ত্রী ও শ্বশুড়ের নামেও রয়েছে বলেও জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুমনের পিতা একজন মুদি ব্যাবসায়ী এবং মা হলেন একজন গৃহীণী। এছাড়া তার শ্বশুর একজন গ্রাম্য চিকিৎসক। তার পারিবারিক অবস্থা ততটা স্বচ্ছল ছিলো না। কিন্ত হঠাৎ করেই কোটিপটি বনে যান তিনি। এছাড়া এলাকাবাসীও সঠিক ভাবে বলতে পারে না সুমন আসলে কি কাজ করে।
এলাকাবাসী জানান, কয়েকবছর আগেও সুমনদের বাড়ি ছিলো একতলা। হঠাৎ করেই কোটি টাকা খরচ করে বিশাল তিন তলা বাড়ি নির্মাণ করেন সুমন। সুমনের বাড়ি নির্মাণের বিষয় নিয়ে এলাকাবাসী আশ্চর্য। এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, সুমনের বড় ভাই আগে বিদেশে ছিলেন। এখন দেশে আছেন। তবে উন্নত কোন দেশেও ছিলেন না তিনি। এছাড়া সুমনের আরেক ভাইও বিদেশে আছেন তিনিও কোন উন্নত দেশে যাননি। ফলে কোটি টাকা খরচ করে তাদের পক্ষে বাড়ি বানানো সম্ভব নয়। তাই হঠাৎ করেই সুমনের পরিবারের বাড়ি নির্মাণের বিষয় নিয়ে আশ্চর্য এলাকাবাসী।

এছাড়া সুমনের স্কুল জীবনের এক বন্ধু বলেন, আমরা স্কুল লাইফে রাজরামপুর হামিদুল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে একসাথে পড়াশোনা করতাম। ২০১৮ সালের দিকে আমরা যখন অনার্সে পড়ি তখন জানতে পারি সুমন বিমানে করে নাকি যাতায়াত করে। একজন সাধারন পরিবারের ছেলে অনার্স পড়া অবস্থায় বিমানে কিভাবে যাতায়াত করে তা নিয়ে কৌতহুল সৃষ্টি হয়। পরে খোঁজ নিয়ে আরোও জানতে পারি সুমন ঢাকায় একটি কম্পিউটারের দোকানে কাজ করতো। সেখান থেকেই আওয়ামী লীগের নেতা ও চিকিৎসকদের সাথে তার সখ্যতা তৈরি হয়। তারপর থেকেই রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মেডিকেল সেক্টরের কাজগুলো সে করে থাকে। বর্তমানে সুমন এলাকায় অনেক টাকা পয়সার মালিক। এলাকার মসজিদ মাদ্রাসায় সব চেয়ে বেশি দান করে সে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার জোড়গাছি এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাদের জানান, সুমনের পরিবার অতি সাধারন একটি পরিবার। তার পরিবারকে এলাকায় লোদ (উচ্চতায় ছোট) পরিবার হিসেবে পরিচিত। তার পিতা একটি ছোট মুদিখানার দোকান করতো। সুমন ২০১২ কিংবা ১৩ সালের দিকে বাড়ির পাশে একটি কম্পিউটারের দোকান দিয়েছিল। সেইখানে গান লোড ও ছবি পিন্টের কাজ করতো। ভালো কাজ জানার সুবাদে ঢাকায় গিয়ে পিন্টিং প্রেসে সে কাজ করতো। লোক মারফত শুনেছি প্রিন্টিং প্রেসে কাজ করার সময় আওয়ামী লীগের কোন নেতার (মন্ত্রীও হতে পারে) মেয়ের বিয়ের কার্ড ছাপানোর দায়িত্ব পায় সে। তারপর থেকে সেই আওয়ামী লীগ নেতার সাথে তার সংখ্যতা গড়ে উঠে। পরে বিভিন্ন চিকিৎসকদের সাথে তার ভালো সম্পর্ক হয়ে উঠে। এলাকার কেউ ঢাকায় চিকিৎসা করতে গেলে তার রেফারেন্স দিলে কোন সিরিয়াল লাগে না। হঠাৎ করেই অনেক টাকার মালিক বনে যায় সুমন। এটা অবশ্যই আশ্চর্যের বিষয়। ঢাকায় সে কি কাজ করে এনিয়ে এলাকায় কানাঘোষা হয়। একটি সাধারন পরিবারের ছেলের হঠাৎ পরিবর্তন হলে যা হয় আরকি। সে চিকিৎসক নয় এটি বলতে পারি তবে কি কাজ করে তা জানি না।
গোবরাতলা ইউনিয়নের তরিকুল ইসলাম নামের এক বাসিন্দা বলেন, সুমনকে শুশুড় বাড়ি এই এলাকায়। সবাই তাকে ডাক্তার হিসেবেই চিনে। তার শুশুড়ও গ্রাম্য ডাক্তার। সুমনের মাধ্যমে আমি ঢাকায় চিকিৎসা করাতে যাই। তখন তার আচার আচরণ দেখে সন্দেহ হয় এবং ঢাকায় জানতে পারি সে ডাক্তান নয়। তার শুশুড় বাড়ি এলাকাসহ নাচোল উপজেলায় অনেক জমি কিনেছে সুমন। বস্তাটাতে করে টাকা নিয়ে এসে এই জমিগুলো ক্রয় করেছে।
স্বাচিপ ও বিএমএ নেতা গোলাম রাব্বানীর সাথে সখ্যতা:
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রভাবশালী চিকিৎসক নেতা ছিলেন ডা. গোলাম রাব্বানী। তিনি একাধারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শাখা স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) আহবায়ক ও বিএমএ’র সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা হওয়ার সুবাদে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন এই আওয়ামী লীগ নেতা। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি সুনাম ধন্য বেসরকারী ক্লিনিকের চেয়ারম্যান পদেও ছিলেন তিনি। ক্লিনিকটির চেয়ারম্যান হওয়ার কারণে চেম্বারের পাশের কক্ষেই গড়ে তুলেছেন নিজের অলিখিত রাজনৈতিক কার্যালয়। প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও বেসরকারী ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতি হওয়ার কারণে ডা. গোলাম রাব্বানীর সাথে সংখ্যতা গড়ে উঠেছিল সুমনের। তাই কেউ কোন সমস্যা নিয়ে ডা. গোলাম রাব্বানীর কাছে গেলে তার অলিখিত রাজনৈতিক কার্যালয়ে সুমনকে দেখিয়ে দিতেন এবং তার মাধ্যমে কাজ করার পরামর্শ দিতেন তিনি। এর বরাতে ডা. গোলাম রাব্বানী মোটা অংকের উৎকোচ পেতেন সুমনের কাছে।
নাম না প্রকাশে এক চিকিৎসক জানান, ডা. গোলাম রাব্বানী আওয়ামী লীগ আমলে প্রভাবশালী থাকলেও ক্লিনিক ম্যানেজমেন্টের অফিসিয়ালি কাজগুলো সে করতে পারতো না। ক্লিনিক মালিক সমিতির সদস্যরা তার কাছে কোন কাজ নিয়ে আসলে সে সুমনকে দেখিয়ে দিতো। ফলে সুমনের জন্য ক্লিনিক মালিক সমিতির সদস্যদের সহজেই জিম্মি করতে পারতো সুমন এবং তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকাও বাগিয়ে নিতো সে। এর কিছু ভাগ ডা. গোলাম রাব্বানীও পেতো। যা দিয়েই মূলত সে রাজনীতির কার্যক্রম চালিয়ে নিতো।
তবে ০৫ আগষ্টের পর থেকেই বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার ও পলাতক থাকার কারণে ডা. গোলাম রাব্বানীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সুমনের বক্তব্য:
সুমনের বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া শুরু হলেই তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক ও হোয়াট আপস) থেকে প্রোফাইল ডিজেইবল করে দেয়। তার পরিবারের কারোও কাছে তার নাম্বারও পাওয়া যায়নি। তবে সুমনের পক্ষ থেকে একাধিক ব্যাক্তি প্রতিবেদকের যোগাযোগ করেন এবং সংবাদ প্রকাশ না করতে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখান। এছাড়া সুমনের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সুমন সিন্ডিকেটের ফাঁদে যেভাবে পড়ছেন ক্লিনিক ব্যাবসায়ী, চিকিৎসক ও মেডিকেল স্টাফরা:
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যমতে, জেলায় মোট ১৫৫টি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। তার মধ্যে সদর উপজেলায় ৭১টি, শিবগঞ্জে ৩৯টি গোমস্তাপুরে ৩৩ টি নাচোলে ০৫টি ও ভোলাহাটে ০৭টি ক্লিনিক ও ডায়গনস্টিক সেন্টার রয়েছে। বেশির ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো ভাড়া বিল্ডিং নিয়ে পরিচালিত হয়। যে বিল্ডিংগুলোর বেশির ভাগই বাসা বাড়ি, অফিস অথবা বাণিজ্যিক ভবনের আদলে নির্মাণ করা হয়েছে। পরে সেইগুলো ভাড়া নিয়ে আংশিক কাঠামোগত পরিবর্তন করে ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রুপান্তরিত করা হয়। ফলে ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নিতে গিয়ে ফায়ার, পরিবেশগত ছাড়পত্র নিতে বেগ পেতে হয় ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিকের মালিকদের। আর এই সুযোগটাকেই কাজে লাগাই সুমন সিন্ডিকেট।
অপরদিকে চিকিৎসকরা তাদের প্রাইভেট মেডিকেল প্রাকটিস দীর্ঘস্থায়ী করারা জন্য নিজ বিভাগীয় অথবা জেলা শহরে পোস্টিং পেতে চান এবং সেই পোস্টিং দীর্ঘদিন আঁকড়ে ধরে রাখার প্রবণতাও রয়েছে৷ খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পদায়ন চান না। উপজেলা হাসপাতালে গুলোতে পদায়ন হলেও তারা দ্রুত বিভাগীয় ও জেলা শহরের হাসপাতালে গুলোতে পদায়ন নিয়ে চলে আসতে চান। এরজন্য অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসকদের পদায়ন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই সুযোগটায় কাজে লাগান সুমন সিন্ডিকেট।
এছাড়া হাসপাতালের বিভিন্ন পদে স্টাফ হিসেবে চাকরিরতরাও বাইরের জেলায় থাকতে চান না। নিজ জেলায় বাড়ির কাছাকাছি হাসপাতালগুলোতে পদায়ন চান। ফলে সুমন সিন্ডিকেটের ফাঁদে পড়েন তারা।
এম.এ.এ/আ.আ
মন্তব্য করুন: